জয় দু’পক্ষের, হারলও সেই দু’পক্ষই!

Staff Reporter

জয় দু’পক্ষের, হারলও সেই দু’পক্ষই! কেন্দ্রের নাটকীয় পঞ্চায়েত মেসেজে বাহিনী নাট্যেই দফা-রফা?

এই মুহূর্তে সব পক্ষই মনে করছে, পঞ্চায়েতের ‘বাহিনী বনাম দফা’র জট কেটে গেল। কেটে তো গেল। তবুও লাভ হল কার? কোন পক্ষের? কে জিতছেন? কে হারছেন?

কলকাতা হ্যালো কোর্টের উৎকৃষ্ট বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চের দিকেই তখন তাকিয়ে সব পক্ষ। ইলেকশন চলে এল। তা সত্ত্বেও বাহিনী আর দফার মেজারমেন্ট মেলানো যাচ্ছে না। টানটান উত্তেজনা। কী হয় কী হয় পরিস্থিতি। শুনানি তখন মধ্যপর্বে। বলছেন বিজেপির আইনজীবী। হঠাৎই রাজ্য নির্বাচন কমিশনের সচিব নীলাঞ্জন শাণ্ডিল্য মোবাইল দেখতে দেখতে উঠে গেলেন কমিশনেরই উকিল জিষ্ণু সাহার কাছে। সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের পরেই জিষ্ণু বেঞ্চকে বললেন, ‘‘মাই লর্ড, আমার একটা কথা বলার আছে। এইমাত্র খবর পেলাম, কেন্দ্র আরও ৪৮৫ কোম্পানি বাহিনী মঞ্জুর করে দিয়েছে।’’

মুহূর্তে বদলে গেল আদালতের পরিস্থিতি। একটা কঠোর জট যেন এক মুহূর্তে কেটে গেল। সত্যিই কেটে গেল কি না তা জানতে অবশ্য অন্তত মঙ্গলবারের শুনানি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তা সত্ত্বেও এই মুহূর্তে সব পক্ষই মনে করছে, পঞ্চায়েতের ‘বাহিনী বনাম দফা’র জট কেটে গেল। কেটে তো গেল। অথচ লাভ হল কার? কোন পক্ষের? কে জিতছেন? কে হারছেন? আদালত প্রাঙ্গণে প্রতিক্রিয়া নিতে গিয়েই বোঝা যাচ্ছিল, সবারই হাসছি কিন্তু হাসছি না পরিস্থিতি। হারজিতের দাঁড়িপাল্লায়, কমিশন-কেন্দ্র (বাহিনী নিয়ে) দীর্ঘ স্নায়ুযুদ্ধের পর লক্ষ্য যাচ্ছে— যুযুধান উভয় পক্ষই কিছুটা জিতলেন, কিছুটা হারলেন।কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানম এবং বিচারপতি উদয় গুপ্তের ডিভিশন বেঞ্চে শুনানির সময়ই সোমবার জানা যায়, বিরোধীদের দাবি এবং কলকাতা হাই কোর্টের আদেশ মেনে সমাপ্ত পর্যন্ত পঞ্চায়েত ভোটের জন্য রাজ্যে আসতে ঘটমান একটানা ৮২২ কোম্পানী কেন্দ্রীয় বাহিনী। সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এই ঘোষণাকে ‘বিরোধীদের জয়’ এবং বলে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

Advertisement

অন্য দিকে, রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচনের পাঁচ দিন প্রথমে কলকাতা হ্যালো আদালত সোমবার সরাসরি ভাবে ভোটগ্রহণের দফা বাড়ানোর জন্য আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকির অ্যাপ্লাই করে দিয়েছে। যদিও প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি আকুল চৌধুরী আবেদন-সহ দফা সংক্রান্ত কয়েকটি মামলা এখনও হ্যালো কোর্টের বিচারাধীন। মঙ্গলবার তার শুনানি। তা সত্ত্বেও সোমবার কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠানোর নির্দেশের পর কমিশনের একাংশ মনে করছে, ভোটের চার দিন আগে দফা বাড়ানোর নির্দেশ দেবে না হ্যালো কোর্ট। তা হলে আকর্ষণ বন্দ্যোপাধ্যারের রাষ্ট্রের ‘জয়’ বলে একে মার্ক করা যেতে পারে। কারণ, বিরোধীরা একের অধিক দফায় ভোট দাবি করলেও রাজ্য গভর্নমেন্ট বরাবরই এক দফায় ইলেকশন চেয়েছে।

সোমবার পঞ্চায়েতে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন নিয়ে আদালত অবমাননার মামলা চলাকালীনই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের তরফে জানানো হয়, আদালতের নির্দেশ মেনে বাকি ৪৮৫ কেন্দ্রীয় বাহিনীও পাঠানো হবে বাংলায় পঞ্চায়েত ভোটের জন্য। ফলে হঠাৎই বদলে যায় মামলার সওয়াল জবাব। আদালত জানায়, সোমবার আর এই নিয়ে শুনানি নয়, পরের দিন অর্থাৎ মঙ্গলবার এই নিয়ে শুনানি হবে ডিভিশন বেঞ্চে। প্রথম দফায় ২২ সংস্থা কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং পরে এইরকম ৩১৫ এজেন্সি কেন্দ্রীয় বাহিনী এসেছিল রাজ্যে। ৩য় দফায় ৪৮৫ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী এলে পঞ্চায়েত ভোটের জন্য সর্বমোট ৮২২ সংগঠন কেন্দ্রীয় বাহিনী আসবে রাজ্যে। যা আদতে বিরোধীদের দাবিরই স্বীকৃতি।প্রসঙ্গত, রাজ্য নির্বাচন কমিশন বিচারালয় অবমাননা করেছে বলে পৃথক ভাবে পিটিশন করেছিলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী তার সাথে মালদহের কংগ্রেস সাংসদ আবু হাসেম খান চৌধুরী (ডালু)। পঞ্চায়েতের বৈরিতা ঠেকাতে গত ১৩ তার সাথে ১৫ জুন অতুলনীয় বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ যে আদেশ দিয়েছিল, ইচ্ছাকৃত ভাবে তা মানা হয়নি বলে আবেদনকারীরা নালিশ জানিয়েছিলেন। এর পর ২১ জুন শ্রেষ্ঠ বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানম এবং বিচারপতি উদয় গুপ্তের ডিভিশন বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছিল ৮২ হাজার (৮২২ কোম্পানি) কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করার জন্য হবে কমিশনকে। সেই নির্দেশ মেনে ডিস্কাউন্ট বাহিনীর জন্য কেন্দ্রের কাছে আবেদন জানিয়েছিল। সোমবার তা মেনে নিল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের মন্ত্রক।

হাই কোর্টে নাটকীয় শুনানি

Advertisement

প়ঞ্চায়েত ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়ন নিয়ে নাটকীয় পরিস্থিতির সাক্ষী হল কলকাতা হাই কোর্ট। কমিশনের বিপক্ষে কোর্ট অবমাননার ওই মামলার শুনানিতে জিষ্ণু শুরুতে বেঞ্চকে জানিয়ে দেন আবেদন মেনে বাহিনী দেওয়ার ক্ষেত্রে অপারগতার কথা জানিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। উনি বলেন, “সাধারণত স্পর্শকাতর বুথে অতিরিক্ত সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হয়। কিন্তু সম্প্রতি যা কেন্দ্রীয় বাহিনী বিদ্যমান তাতে প্রতি বুথে দেওয়া পসিবল নয়। কেন্দ্রীয় বাহিনী ভোটারদের বিশ্বাস বাড়ানো তার সাথে অঞ্চল টহলদারির জন্য রাখার চিন্তা করা হয়েছে। কারণ, ৮২২ সংগঠন বাহিনীর আয়োজন করা যায়নি। কেন্দ্র ৩৩৭ এজেন্সি দেবে বলেছে। তার ভিতরে ১১৩ এজেন্সি বাহিনী এখনও আসেনি। চলে আসবে বলেছে।”

এর পরে দিল্লি হতে ভার্চুয়াল শুনানিতে অংশ নেওয়া বিজেপির আদালতে গুরুকৃষ্ণ সওয়াল চালু করেন। সে সময়ই হঠাৎ শাণ্ডিল্য হন্তদন্ত হয়ে উঠে যান জিষ্ণুর কাছে। উনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নয়া নির্দেশিকার কথা জানিয়ে দেন আদালতকে। তার পরে সওয়াল সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে বেঞ্চ জানায়, মঙ্গলবার পঞ্চায়েত মামলায় আবার শুনানি হবে। কোর্ট অবমাননা মামলায় কেবল কেন্দ্রীয় বাহিনী নয়, আগের যত আদেশ সমস্তই কার্যকর করা হয়েছে কি না জানিয়ে কমিশনের নিকট রিপোর্ট চেয়েছিল হ্যালো কোর্ট। মঙ্গলবার পরিবর্তিত পরিস্থিতিকে মাথায় রেখে আবার সেই রিপোর্ট কমিশনকে জমা দেওয়ার জন্য হবে বলে জানিয়েছে আদালত।

পঞ্চায়েতের দফা-রফা মঙ্গলবার?

Advertisement

কলকাতা হাই কোর্টে পঞ্চায়েত ভোটের দফা বৃদ্ধির আর্জি জানিয়ে জনস্বার্থ মামলা করেছিলেন ভাঙড়ের বিধায়ক তথা আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ। তাঁর যুক্তি ছিল, হয় পঞ্চায়েত ভোটে আদালতের আদেশ মতো প্রচুর বাহিনী আনা হোক কিংবা পঞ্চায়েত ভোটের দফা বৃদ্ধি করা হোক। আদালতের নির্দেশিত ‘২০১৩ বর্ষের মতো বাহিনী’-র কথা মনে করিয়ে দিয়ে নওশাদ কারণ দেখিয়েছিলেন, রাজ্যে গত ১০ সালের জেলার পরিমান বেড়েছে, ভোটার এবং বুথের সংখ্যাও বেড়েছে। তাই অনেক কেন্দ্রীয় বাহিনী না দেওয়া হলে ভোটও ২০১৩ বছরের মতোই কতিপয় দফায় করানো উচিত। নওশাদ জানিয়েছিলেন, ভোটারদের সিকিউরিটির কথা ভেবেই তাঁর এই প্রস্তাব।

সোমবার অধীরের আইনজীবীও কিছুটা একই কথা বলেছেন। তবে তিনি নিরাপত্তা সংক্রান্ত ‘বিপন্নতা’র ব্যাপারটা এইরকম নির্দিষ্ট করে জানান। অন্য দিকে, কমিশনের উকিল জানিয়েছিলেন, ২০১৮ বর্ষের মতোই এ বারেও এক দফাতেই ইলেকশন চান তাঁরা।

আব্বাসের আবেদন পরিত্যক্ত করলেও অতুলনীয় বিচারপতি শিবজ্ঞানম এবং বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্যের ডিভিশন বেঞ্চ সোমবার দফা বাড়ানোর ব্যপারে ব্যাকুল চৌধুরীর আপিল গ্রহণ করেছে। মঙ্গলবার ওই আবেদনটিও শুনানি হতে পারে। যদিও মঙ্গলবার এই মামলায় দফা বৃদ্ধির আর্জি গৃহীত হলে চার দিনের মধ্যে পঞ্চায়েত ভোটের দফা বৃদ্ধি কী ভাবে হবে, সে ক্ষেত্রে পঞ্চায়েত ভোট পিছিয়ে যাবে কি না, তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে।

Advertisement

পঞ্চায়েত ইলেকশন নিয়ে একের পর এক মামলা প্রসঙ্গে সোমবার কার্যত উষ্মা প্রকাশ করেন কলকাতা হ্যালো কোর্টের সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানম। পঞ্চায়েত জনিত মামলার সাহায্যে কেউ কেউ শিরোনামে (হেডলাইন) আসতে চাইছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি । মামলাকারীদের প্রত্যেকের ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্য’ আছে বলেও জানিয়ে দেন উৎকৃষ্ট বিচারপতি। কোর্ট ঘরে উপস্থিত উকিলদের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, “পঞ্চায়েত ভোট নিয়ে অনেক মামলা দায়ের হয়েছে। বলতে বশীভূত হচ্ছি, আপনাদের প্রত্যেকের রাজনৈতিক লক্ষ্য রয়েছে। প্রত্যেকে হেডলাইনে আসতে চান।” এই প্রসঙ্গেই তাঁর সংযোজন, “দয়া করে এর জন্য আদালতকে ব্যবহার করবেন না। করুণা করে আমাদের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করবেন না।”

আরও পড়ুন

Latest articles

Leave a Comment

%d bloggers like this: